বাজেটের মধ্যে প্রিমিয়াম সব ফিচার দেওয়ার জন্য শাওমির ‘নোট’ সিরিজের আলাদা একটি সুনাম রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই বাজারে রাজত্ব করছে Xiaomi Redmi Note 13 Pro। বিশেষ করে এর ২০০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা, চোখধাঁধানো ডিসপ্লে আর পাওয়ারফুল প্রসেসর নিয়ে গ্যাজেটপ্রেমীদের মধ্যে তুমুল আগ্রহ।
আপনি যদি এই বাজেটে একটি অল-রাউন্ডার ফোন খোঁজার উদ্দেশ্যে এটি কেনার কথা ভেবে থাকেন, তবে এই রিভিউটি আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। দীর্ঘ সময় ব্যবহারের পর এর ভালো ও মন্দ সব বাস্তব অভিজ্ঞতা নিচে তুলে ধরা হলো।
আরো পড়ুন – লাভা বোল্ড ৫জি দাম কত বাংলাদেশে
এক নজরে রেডমি নোট ১৩ প্রো-এর মূল স্পেসিফিকেশন
- ডিসপ্লে: ৬.৬৭ ইঞ্চি AMOLED, ১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেট, ১.৫K রেজোলিউশন।
- ক্যামেরা: ২০০ মেগাপিক্সেল (প্রধান) + ৮ মেগাপিক্সেল (আল্ট্রা-ওয়াইড) + ২ মেগাপিক্সেল (ম্যাক্রো)। ১৬ মেগাপিক্সেল ফ্রন্ট ক্যামেরা।
- প্রসেসর: স্ন্যাপড্রাগন ৭এস জেন ২ (Snapdragon 7s Gen 2)।
- ব্যাটারি ও চার্জিং: ৫১০০ mAh ব্যাটারি এবং ৬৭ ওয়াটের ইন-বক্স ফাস্ট চার্জার।
- সুরক্ষা: গরিলা গ্লাস ভিক্টাস এবং IP54 ডাস্ট ও স্প্ল্যাশ রেজিস্ট্যান্স।
ডিজাইন ও বিল্ড কোয়ালিটি কেমন করেছে
প্রথমবার হাতে নিলে ফোনটিকে বেশ প্রিমিয়াম মনে হয়। এর ব্যাক পার্ট কাঁচের তৈরি হলেও সাইড ফ্রেমটি প্লাস্টিকের, যা এই বাজেটে স্বাভাবিক। তবে এর সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট হলো এর ডিসপ্লে সুরক্ষায় ব্যবহৃত Gorilla Glass Victus। ফলে হাত থেকে ছোটখাটো পতনে স্ক্রিন সহজে ভাঙবে না এবং স্ক্র্যাচ পড়ার ভয়ও কম।
ফোনটির ওজন মাত্র ১৮৭ গ্রাম এবং এটি বেশ স্লিম। তাই একহাতে দীর্ঘক্ষণ ব্যবহার করলেও হাতে কোনো ক্লান্তি আসে না। এতে IP54 রেটিং রয়েছে, যা হালকা বৃষ্টি বা ধুলোবালি থেকে ফোনটিকে সুরক্ষিত রাখবে। তবে ভুলেও এটিকে পানিতে ভেজাতে যাবেন না।
ডিসপ্লে অভিজ্ঞতা
শাওমি এই ফোনে দিয়েছে একটি চমৎকার ৬.৬৭ ইঞ্চির ১.৫K AMOLED ডিসপ্লে। ১২-বিট কালার সাপোর্ট এবং ২৭১২ x ১২২০ পিক্সেল রেজোলিউশন থাকার কারণে এর কালার আউটপুট অসাধারণ। ইউটিউব বা নেটফ্লিক্সে ৪K কন্টেন্ট দেখার সময় প্রতিটি রঙ একদম জীবন্ত মনে হয়।
গেম খেলা বা ব্রাউজিংয়ের সময় এর ১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেট স্ক্রলিংকে দেয় একদম মাখনের মতো স্মুথ ফিল। আর আউটডোর বা কড়া রোদে ব্যবহারের জন্য এর ১৮০০ নিটস পিক ব্রাইটনেস দারুণ কাজ করে; স্ক্রিনের লেখা পড়তে বিন্দুমাত্র কষ্ট হয় না।
ক্যামেরা: ২০০ মেগাপিক্সেল কি সত্যিই কাজের?
সবার মনেই প্রশ্ন থাকে—২০০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা কি আসলেই কাজের?
- দিনের আলোতে: মেইন ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবির ডিটেইলস এবং শার্পনেস এক কথায় দুর্দান্ত। কালার কিছুটা বুস্টেড বা উজ্জ্বল দেখায়, যা সোশ্যাল মিডিয়া রেডি ছবির জন্য চমৎকার। ডাইনামিক রেঞ্জও বেশ ভালো ব্যালেন্স করে।
- লো-লাইট বা রাতে: রাতের আলোতে নাইট মোড অন করলে ভালো ছবি আসে, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামান্য নয়েজ বা আর্টিফ্যাক্ট চোখে পড়তে পারে। এই বাজেটের ফোন হিসেবে পারফরম্যান্সটি মেনে নেওয়ার মতো।
- অন্যান্য লেন্স: এর ৮ মেগাপিক্সেল আল্ট্রা-ওয়াইড লেন্সটি চলনসই, তবে ২ মেগাপিক্সেল ম্যাক্রো লেন্সটি খুব একটা কাজের নয়।
- ভিডিও ও সেলফি: মেইন ক্যামেরা দিয়ে OIS (Optical Image Stabilization) সহ ৪K ভিডিও রেকর্ড করা যায়, যা বেশ স্টেবল। আর সামনের ১৬ মেগাপিক্সেলের সেলফি ক্যামেরা দিয়ে বেশ ন্যাচারাল এবং সুন্দর স্কিন টোনের ছবি পাওয়া যায়।
পারফরম্যান্স ও সফটওয়্যার
ফোনটিতে ব্যবহার করা হয়েছে Snapdragon 7s Gen 2 চিপসেট। দৈনন্দিন কাজ যেমন—ফেসবুকিং, মাল্টিটাস্কিং, ব্রাউজিং বা ভিডিও এডিটিংয়ের ক্ষেত্রে ফোনটি অত্যন্ত দ্রুত কাজ করে। ল্যাগ বা হ্যাং হওয়ার কোনো বালাই নেই।
গেমিং পারফরম্যান্স: পাবজি (PUBG), ফ্রি-ফায়ার বা কল অব ডিউটির মতো গেমগুলো হাই গ্রাফিক্স সেটিংসে বেশ স্মুথলি খেলা যায়। তবে খুব ভারী গেমিং দীর্ঘক্ষণ করলে ফোনটি সামান্য গরম হতে পারে, যা সাধারণ বিষয়।
সফটওয়্যার: ফোনটি বাজারে আসার পর বেশ কিছু আপডেট পেয়েছে। বর্তমানে এটি শাওমির নতুন HyperOS এবং অ্যান্ড্রয়েড ১৪-এ চমৎকারভাবে রান করছে, যা আগের MIUI-এর চেয়ে অনেক বেশি অপ্টিমাইজড এবং বগমুক্ত।
ব্যাটারি ও চার্জিং
এতে রয়েছে ৫১০০ mAh-এর শক্তিশালী ব্যাটারি। সাধারণ ব্যবহারে অনায়েসে এক থেকে দেড় দিন ব্যাকআপ পাওয়া যায়। আর হেভি ইউজার হলেও এক দিন পার হয়ে যাবে।
তবে আসল চমক এর চার্জারে। বক্সে থাকা ৬৭ ওয়াটের ফাস্ট চার্জার দিয়ে মাত্র ১৭-১৮ মিনিটে ফোনের প্রায় ৫০% চার্জ হয়ে যায়। আর শূন্য থেকে ফুল চার্জ হতে সময় লাগে মাত্র ৪৫ মিনিটের মতো। ফলে চার্জিং নিয়ে বাড়তি কোনো টেনশনই করতে হয় না।
শাওমি রেডমি নোট ১৩ প্রো এর দাম বাংলাদেশে
বর্তমানে দেশের বাজারে এই ফোনটি অফিসিয়াল এবং আনঅফিশিয়াল উভয় ভেরিয়েন্টেই পাওয়া যাচ্ছে। র্যাম ও রম ভেরিয়েন্ট অনুযায়ী আনুমানিক বাজারমূল্য নিচে দেওয়া হলো:
| ভেরিয়েন্ট (RAM/ROM) | আনুমানিক দাম (টাকা) |
| ৮ জিবি / ১২৮ জিবি | ৩১,০০০ – ৩২,৫০০ টাকা |
| ৮ জিবি / ২৫৬ জিবি | ৩৩,০০০ – ৩৪,৫০০ টাকা |
| ১২ জিবি / ২৫৬ জিবি | ৩৫,০০০ – ৩৬,৫০০ টাকা |
দ্রষ্টব্য: শপ ভেদে দাম কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
ভালো ও মন্দ দিক (Pros & Cons)
যেকোনো ডিভাইস কেনার আগে এর পজিটিভ ও নেগেটিভ দিকগুলো জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
পজিটিভ দিক:
- ওআইএস (OIS) সহ দুর্দান্ত ২০০ মেগাপিক্সেল মেইন ক্যামেরা।
- প্রিমিয়াম ১.৫K ক্রিস্টালরেস অ্যামোলেড ডিসপ্লে।
- গরিলা গ্লাস ভিক্টাসের শক্তিশালী স্ক্রিন প্রোটেকশন।
- দ্রুতগতির ৬৭ ওয়াট চার্জিং এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি।
- স্লিম, হালকা ও দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন।
নেগেটিভ দিক:
ফুল ওয়াটারপ্রুফ বা IP68 রেটিং নেই (শুধুমাত্র IP54)।
আল্ট্রা-ওয়াইড এবং ম্যাক্রো ক্যামেরার মান আরও উন্নত হতে পারত।
কোনো ডেডিকেটেড মাইক্রো-এসডি কার্ড স্লট নেই (হাইব্রিড স্লট)।
আমার মতামত
পকেটে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার বাজেট থাকলে এবং আপনার প্রধান চাহিদা যদি হয় একটি দুর্দান্ত ক্যামেরা, প্রিমিয়াম ডিসপ্লে এবং ফাস্ট চার্জিং—তবে Xiaomi Redmi Note 13 Pro আপনার জন্য এই মুহূর্তে অন্যতম সেরা চয়েস হতে পারে।
তবে ফোনটি কেনার আগে অবশ্যই শপের ওয়ারেন্টি পলিসি এবং ফোনটি অফিসিয়াল নাকি আনঅফিশিয়াল তা নিশ্চিত হয়ে নিন। জেনুইন পারফরম্যান্স ও আফটার-সেলস সার্ভিসের জন্য অফিসিয়াল ফোন কেনাই সবচেয়ে নিরাপদ।
আপনার কি এই ফোনটি নিয়ে কোনো প্রশ্ন আছে? অথবা এর ডিজাইন আপনার কেমন লেগেছে? নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানিয়ে দিন!
তথ্যসূত্র: https://www.mi.com/bd/product/redmi-note-13-pro/
আমি মোহাম্মদ বেলাল হোসেন। প্রযুক্তির নেশা আর নতুন সব ডিভাইসের খুঁটিনাটি জানার আগ্রহ থেকেই আমার এই পথচলা। বর্তমানে আমি একজন টেক ব্লগার, মোবাইল রিভিউয়ার এবং গ্যাজেট বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছি।