স্যামসাংয়ের ‘A’ সিরিজের ফোনগুলো বরাবরই মধ্যবিত্ত বা মিড-রেঞ্জ বাজেট ক্রেতাদের আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকে। ২০১৯ সালের দিকে যখন Samsung A50 বাজারে আসে, তখন এর দাম ছিল ২০-২৫ হাজার টাকার কাছাকাছি। অথচ আজ ২০২৬ সালে এসে এই সিরিজের লেটেস্ট ফোন Samsung Galaxy A57 5G-এর দাম আকাশচুম্বী! এআই (AI) প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গ্লোবাল মার্কেটের কারণে দাম কিছুটা বাড়া স্বাভাবিক, তবে এই দাম কতটা যৌক্তিক—তা নিয়েই আজকের বিস্তারিত আলোচনা।
আপনি যদি এই ফোনটি কেনার কথা ভেবে থাকেন, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রিভিউটি শেষ পর্যন্ত পড়ে নিন।
Samsung Galaxy A57 Price in Bangladesh
বাংলাদেশে Samsung Galaxy A57 এই মোবাইল ফোনের অফিশিয়াল দাম ৭৮,১৯৯ টাকা (৮জিবি+২৫৬জিবি) ও ৮৬,৫৯৯ টাকা (১২জিবি+২৫৬জিবি)।
আর আন অফিসিয়ালটি যদি কিনতে চান তাহলে এর মোবাইলের দাম ৫২,৫০০ টাকা (৮জিবি+২৫৬জিবি)।
Samsung Galaxy A57 মূল স্পেসিফিকেশন জেনে নিন
| বৈশিষ্ট্য | স্পেসিফিকেশন (বিস্তারিত) |
| ডিসপ্লে | ৬.৭ ইঞ্চি FHD+ Super AMOLED Plus, ১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেট, ১৯০০ নিটস ব্রাইটনেস |
| প্রসেসর | Exynos 1680 (৪ ন্যানোমিটার), অক্টা-কোর |
| র্যাম (RAM) | ৮ জিবি / ১২ জিবি (LPDDR5x) |
| স্টোরেজ | ১২৮ জিবি / ২৫৬ জিবি / ৫১২ জিবি (UFS 3.1) |
| পেছনের ক্যামেরা | ৫০ মেগাপিক্সেল (মেইন, OIS) + ১২ মেগাপিক্সেল (আল্ট্রাওয়াইড) + ৫ মেগাপিক্সেল (ম্যাক্রো) |
| সেলফি ক্যামেরা | ১২ মেগাপিক্সেল (4K ভিডিও রেকর্ডিং সুবিধা সহ) |
| ব্যাটারি | ৫০০০ mAh (লিথিয়াম পলিমার) |
| চার্জিং | ৪৫ ওয়াট ফাস্ট চার্জিং (৩০ মিনিটে ৬০% চার্জ সম্ভব) |
| অপারেটিং সিস্টেম | অ্যান্ড্রয়েড ১৬ (One UI 8.5) |
| নিরাপত্তা | ইন-ডিসপ্লে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর এবং স্যামসাং নক্স (Knox) সিকিউরিটি |
| বডি ও ডিজাইন | গ্লাস ফ্রন্ট এবং ব্যাক (Gorilla Glass Victus+), অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম |
| সুরক্ষা | IP68 ধুলো ও পানি নিরোধক (১.৫ মিটার গভীরে ৩০ মিনিট পর্যন্ত) |
| কানেক্টিভিটি | ৫জি, ওয়াই-ফাই ৬ই, ব্লুটুথ ৬.০, এনএফসি (NFC) |
| রঙ (Colors) | অসম নেভি, অসম আইসিব্লু, এবং অসম লিলাক |
ডিজাইন এবং বিল্ড কোয়ালিটি কেমন করা হয়েছে
ডিজাইনের দিক থেকে স্যামসাং এবার বেশ ভালো কাজ করেছে। আগের মডেল A56-এর তুলনায় ফোনটিকে অনেক বেশি স্লিম (৬.৯ মিমি) এবং হালকা (১৭৯ গ্রাম) করা হয়েছে। এর সাইডের অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেমটি সামান্য বাম্পড বা উঁচু করা, যা ফোনটিকে হাতে ধরার জন্য বেশ আরামদায়ক (Comfortable) করে তোলে।
ফোনের সামনে ও পেছনে ব্যবহার করা হয়েছে শক্তিশালী Corning Gorilla Glass Victus+। তবে ব্যাক সাইড গ্লসি হওয়ায় হালকা আঙুলের ছাপ পড়ে এবং ফোনটি কিছুটা স্লিপারি। ফোনটিতে রয়েছে IP68 রেটিং, যা ১.৫ মিটার গভীর পানিতে ৩০ মিনিট পর্যন্ত ফোনটিকে সুরক্ষিত রাখবে। কিন্তু মনে রাখবেন, হাত থেকে শক্ত মেঝেতে পড়ে গেলে গ্লাস বডি ভেঙে যাওয়ার ভয় কিন্তু থেকেই যায়!
ডিসপ্লে ধরন কেমন করা হয়েছে
ডিসপ্লের দিক থেকে স্যামসাং বরাবরের মতোই সেরা। ৬.৭ ইঞ্চির ফুল এইচডি প্লাস Super AMOLED Plus ডিসপ্লেটি এক কথায় অসাধারণ। ১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেটের কারণে স্ক্রল বা গেম খেলার অভিজ্ঞতা দারুণ স্মুথ। এর বেজেল এবং নিচের অংশ (Chin) এতটাই নিখুঁত ও সিমেট্রিক্যাল যে কন্টেন্ট দেখার সময় দারুণ এক ইমার্সিভ ফিল পাওয়া যায়। আউটডোরে কড়া রোদের মধ্যেও ১৯০০ নিটস পিক ব্রাইটনেসের কারণে ডিসপ্লে দেখতে কোনো সমস্যা হয় না।
পারফরম্যান্স ও সফটওয়্যার: দীর্ঘমেয়াদী ভরসা
ফোনটিতে দেওয়া হয়েছে স্যামসাংয়ের নিজস্ব ৪ ন্যানোমিটারের Exynos 1680 প্রসেসর। দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য—যেমন ফেসবুকিং, ইউটিউব, মাল্টিটাস্কিং বা রেগুলার অ্যাপ চালানো—সবকিছুই একদম ল্যাগ-ফ্রি এবং স্মুথলি করা যায়। এর LPDDR5x র্যাম এবং UFS 3.1 স্টোরেজ ফোনের স্পিড আরও বাড়িয়ে দেয়। স্যামসাংয়ের সফটওয়্যার অপ্টিমাইজেশন ভালো হওয়ায় প্রসেসরের ঘাটতি সহজে টের পাওয়া যায় না। তবে এই বাজেটের অনার বা ভিভো ফোনগুলোতে আরও শক্তিশালী স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসর পাওয়া যায়, যা গেমিংয়ের জন্য এর চেয়ে বেটার।
সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট হলো, এই ফোনে ৬ বছর পর্যন্ত অ্যান্ড্রয়েড ওএস এবং সিকিউরিটি আপডেট পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, ২০৩২ সাল পর্যন্ত ফোনটি একদম লেটেস্ট সফটওয়্যারে চলবে।
ক্যামেরা
কাগজে-কলমে ৫০ মেগাপিক্সেল মেইন, ১২ মেগাপিক্সেল আল্ট্রাওয়াইড এবং ৫ মেগাপিক্সেল ম্যাক্রো লেন্স দেওয়া হয়েছে। স্যামসাং তাদের আগের কয়েকটা মডেলেও ঠিক একই ক্যামেরা সেটআপ ব্যবহার করেছে। প্রায় ৫২ থেকে ৭৮ হাজার টাকার ফোনে কোনো টেলিফটো লেন্স না থাকাটা সত্যিই হতাশাজনক।
- ছবি ও ভিডিও কোয়ালিটি: দিনের আলোতে মেইন ক্যামেরার ছবি ভালো আসলেও মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত ওভার-প্রসেসড মনে হয়। পোর্ট্রেট মোডে সাবজেক্ট সেপারেশন এবং ব্যাকগ্রাউন্ড ব্লার বেশ ন্যাচারাল। ৫ মেগাপিক্সেলের ম্যাক্রো ক্যামেরাটি আসলে খুব একটা কাজের নয়।
- ভিডিওগ্রাফি: পেছনের ক্যামেরা দিয়ে ওআইএস (OIS) সহ বেশ স্টেবল 4K @ 30fps ভিডিও রেকর্ড করা যায়। তবে এই বাজেটে 4K @ 60fps ফিচারটি থাকা উচিত ছিল। ফ্রন্ট ক্যামেরা দিয়েও সুন্দর 4K ভিডিও করা সম্ভব।
ব্যাটারি ও অডিও
৫০০০ mAh ব্যাটারির সাথে এবার দেওয়া হয়েছে ৪৫ ওয়াট ফাস্ট চার্জিং, যা মাত্র ৩০ মিনিটে ফোনটিকে ৬০% পর্যন্ত চার্জ করতে পারে। চার্জার অবশ্য বক্সে পাবেন না, আলাদা কিনতে হবে। ফোনটিতে ৩.৫ মিমি অডিও জ্যাক নেই, তবে এর ডুয়াল স্টিরিও স্পিকারের সাউন্ড যথেষ্ট লাউড এবং ক্লিয়ার।
বাংলাদেশে স্যামসাং গ্যালাক্সি A57 5G এর অফিসিয়াল দাম কত?
বাংলাদেশে Samsung Galaxy A57 এই মোবাইল ফোনের অফিশিয়াল দাম ৭৮,১৯৯ টাকা (৮জিবি+২৫৬জিবি) ও ৮৬,৫৯৯ টাকা (১২জিবি+২৫৬জিবি)।
স্যামসাং গ্যালাক্সি A57 5G-তে কত বছর পর্যন্ত সফটওয়্যার আপডেট পাওয়া যাবে?
স্যামসাং এই ফোনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সাপোর্টের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে আপনি ৬টি বড় অ্যান্ড্রয়েড আপডেট এবং ৬ বছর পর্যন্ত সিকিউরিটি আপডেট পাবেন, যা ফোনটিকে দীর্ঘ সময় ব্যবহারযোগ্য রাখবে।
স্যামসাং গ্যালাক্সি A57 5G এই ফোনে কি পানি বা ধুলোবালিতে কোনো সমস্যা হবে?
না, এই ফোনটি IP68 সার্টিফাইড। এর মানে হলো এটি সম্পূর্ণভাবে ধুলো নিরোধক এবং ১.৫ মিটার গভীর পানিতে ৩০ মিনিট পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখলেও ফোনের কোনো ক্ষতি হবে না।
আমাদের শেষ মতামত: ফোনটি কি আপনার কেনা উচিত?
যাদের জন্য এই ফোনটি সেরা:
আপনি যদি এমন একজন ইউজার হন যার জন্য ফোনের লুক, চমৎকার ডিসপ্লে, ওয়াটারপ্রুফ বডি এবং আগামী ৫-৬ বছর নিশ্চিন্তে সফটওয়্যার আপডেট পাওয়াটা সবচেয়ে বেশি জরুরি, তবে Samsung Galaxy A57 5G আপনার জন্য দারুণ একটা চয়েস হতে পারে।
যাদের এড়িয়ে যাওয়া ভালো:
আপনার বাজেট যদি টাইট হয়, ফোনে যদি মেমোরি কার্ড বা ৩.৫ মিমি হেডফোন জ্যাক ব্যবহার করতে চান, কিংবা আপনি যদি একজন হার্ডকোর গেমার বা ক্যামেরা লাভার (যিনি টেলিফটো লেন্স চান) হন—তবে এই দামে বাজারে অন্য ব্র্যান্ডের আরও ভালো অপশন রয়েছে।
আমি মোহাম্মদ বেলাল হোসেন। প্রযুক্তির নেশা আর নতুন সব ডিভাইসের খুঁটিনাটি জানার আগ্রহ থেকেই আমার এই পথচলা। বর্তমানে আমি একজন টেক ব্লগার, মোবাইল রিভিউয়ার এবং গ্যাজেট বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছি।